বৃহস্পতিবার, ১৮ Jun ২০২৬, ০৬:৪৯ অপরাহ্ন

ব্রেকিং নিউজ :
প্রতিনিধি আবশ্যক: অনলাইন পত্রিকা আমার সুরমা ডটকমের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। আগ্রহীরা যোগাযোগ করুন : ০১৭১৮-৬৮১২৮১, ০১৭৯৮-৬৭৬৩০১
সংবাদ শিরোনাম :
সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতায় এবার ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে তিনশ কোটি টাকা সুনামগঞ্জে এবার ঈদুল আযহায় পৌণে চারশ কোটি টাকার পশু বিক্রির রেকর্ড মাওলানা শুয়াইর আহমদ দিরাই মাদরাসার মুহতামিম নির্বাচিত সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চালু হলো আইসিইউ সেবা দিরাইয়ে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ১০ আসামি আটক সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়ন ছাত্র জমিয়ত শাখার কাউন্সিল অধিবেশন সম্পন্ন সুনামগঞ্জে ঘোষণা দিয়ে সংঘর্ষে হতাহত ২০ ঈদের দিনসহ আগামী পাঁচ দিন আবহাওয়া কেমন থাকবে? জেলা ছাত্র জমিয়তের কঠোর হুশিয়ারী: শহীদ মুশতাক গাজিনগরী হত্যা মামলার ধীরগতিতে প্রশাসনের উদাসিনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে প্রায় চারশ কোটি টাকার লেনদেনের আশাবাদ: সুনামগঞ্জে কুরবাণীর জন্য প্রস্তুত ৫৩ হাজারের বেশি দেশীয় গবাদী পশু
সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতায় এবার ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে তিনশ কোটি টাকা

সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতায় এবার ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে তিনশ কোটি টাকা

amarsurma.com
সুনামগঞ্জে জলাবদ্ধতায় এবার ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে তিনশ কোটি টাকা

মুহাম্মদ আব্দুল বাছির সরদার:
‘মৎস্য-পাথর-ধান, সুনামগঞ্জের প্রাণ’ খ্যাত ভাটি অঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের কৃষকদের মাথায় প্রতি বছরই এক হতাশার কালো মেঘ আঘাত করে। এ জেলার বেশিরভাগ মানুষের পেশা কৃষি হওয়ার কারণেই ধান অর্থনীতির উপর বছরের পুরো সময়টাই চলে এর আয় থেকে। ফলে একজন কৃষক বছরের সার্বিক খরচ জোগাতে কৃষি জমিতে ধান চাষ করেই পরিবারের ভরণ-পোষণ, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করানো, বিয়ে-শাদী, আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। অনেক কৃষক নিজের জমি না থাকায় মহাজনের কাছ থেকে বর্গা (রংজমা), অর্ধেক ধানের চুক্তিতে জমি নিয়ে চাষ করছেন। বর্তমানে ধান আবাদের পুরো প্রক্রিয়ায় বেশি মূল্যে জমি বর্গা নেয়া, বীজ-সার, শ্রমিকসহ সকল উপকরণের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় জমির প্রকৃত মালিক ধান আবাদের প্রতি অনিহা প্রকাশ করে ছেড়ে দিচ্ছেন। যার কারণে সব চেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকগণ। তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনো মতে বেঁচে থাকার তাগিদে ধানের আবাদ করে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। চৈত্র মাসের শেষ দিকে শুরু হওয়া লাগাতার বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় এ বছর সুনামগঞ্জে বোরো আবাদের বড় ধরণের ধাক্কা লেগেছে। যার প্রভাব কৃষকদের মধ্যে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ধান কাটার মৌসুম আসার সাথে সাথেই নানা সমস্যা দেখা দেয়। এরমধ্যে শ্রমিক সংকট, আগাম বন্যার আশঙ্কা, শিলা বৃষ্টি ও বজ্রপাত, অতিবৃষ্টি ইত্যাদি। এ বছর সব সংকটের পাশাপাশি যোগ হয়েছে জ্বালানী তেলের অপ্রাপ্যতা। যদিও দেশে জ্বালানী তেলের কোনো সংকট নেই বলে সরকার প্রচার করছেন, কিন্তু বাস্তবে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখলে সরকারের কথার উল্টো চিত্র পাওয়া যায়। এ থেকে সাধারণ কৃষকদের সমাধানের জন্য বর্তমানে কৃষি কাজে ব্যবহৃত কম্বাইন হারভেস্টের জন্য রেশনিং পদ্ধতিতে তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। এ পদ্ধতিতে একজন মানুষ প্রতিদিন ব্লক সুপার ভাইজার, কৃষি অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ তিনটি জায়গা থেকে স্বাক্ষর নিয়ে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। ফলে একজন মানুষের পুরোদিন চলে যাওয়াতে স্বাভাবিকভাবেই কৃষক ক্ষুদ্ধ ছিলো এ রেশনিং পদ্ধতিতে তেল সরবরাহে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ বছর জেলার ১১টি উপজেলায় ১৬ হাজার ৭৮৬ হেক্টর বোরো ধান জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায়। যা ধানের হিসেবে এক লাখ চার হাজার ৯৮৮ দশমিক সাত মেট্রিকটন। আর চালের হিসেবে ৬৯ হাজার ২৯২ দশমিক ছয় মেট্রিকটন। যার বাজার মূল্য তিনশ ৩৯ কোটি ৫৩ লাখ ৩৫ হাজার ৯৩০ টাকা। সূত্র মতে, এতে এক লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ জেলায় কৃষক পরিবার রয়েছেন তিন লাখ ৭৮ হাজার ৭০৫টি। এরমধ্যে কার্ডধারী তিন লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ জন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক রয়েছেন দুই লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জন, ভূমিহীন কৃষক ৪৯ হাজার ১২৪ জন। জেলার ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে এ বছর ইরি-বোরো আবাদ করা হয়েছিলো। ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিকটন।
এদিকে জেলায় জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত বোরো জমির পরিমাণ হচ্ছে তিন হাজার ৩৩৯ হেক্টর। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ৩৪০ হেক্টর জমি, শান্তিগঞ্জে ১৫৮ হেক্টর, দোয়ার বাজারে ১৮ হেক্টর, জগন্নাথপুরে ৪০৫ হেক্টর, জামালগঞ্জে ৫৪৬ হেক্টর, তাহিরপুরে ১৭৮ হেক্টর, ধর্মপাশায় ৬৫৫ হেক্টর, ছাতকে পাঁচ হেক্টর, দিরাইয়ে ২৭০ হেক্টর, শাল্লায় ৭৬৪ হেক্টর।
সূত্র মতে, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় এ বছর জলাবদ্ধতায় বোরো ধান ডুবেছে ৭৭৬ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে পাঁচ হাজার ৯৫ দশমিক ২৫৮ মেট্রিকটন ধান ও তিন হাজার ৩৬২ দশমিক ৮৭ মেট্রিকটন চাল, যার বাজার মূল্য ১৬ কোটি ৪৭ লাখ ৮০ হাজার ৬৩০ টাকা। শান্তিগঞ্জে ডুবেছে ৭৮০ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে চার হাজার ৬৮০ দশমিক ২২৭ মেট্রিকটন ধান ও তিন হাজার ৮৮ দশমিক ৯৫ মেট্রিকটন চাল, যার বাজার মূল্য ১৫ কোটি ১৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫৫০ টাকা। দোয়ারা বাজারে ৭৮ দশমিক পাঁচ হেক্টর বোরো জমি জলাবদ্ধতায় ডুবেছে, ক্ষতি হয়েছে ৪৫৫ দশমিক নয় হাজার ৯১ মেট্রিকটন ধান ও তিনশ দশমিক নয় মেট্রিকটন চাল, যার বাজার মূল্য এক কোটি ৪৭ লাখ ৪৪ হাজার একশ টাকা। বিশ্বম্ভরপুরে ডুবেছে ৩০ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ১৭৭ দশমিক দুই হাজার ৭২৭ মেট্রিকটন ধান ও ১৭৭ মেট্রিকটন চাল, যার বাজার মূল্য ৫৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। জগন্নাথপুরে ডুবেছে ৪৪৫ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে দুই হাজার ৮২৫ দশমিক ৭৫৮ মেট্রিকটন ধান ও এক হাজার ৮৬৫ মেট্রিকটন চাল, যার বাজার মূল্য ৯১ কোটি ৩৮ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। জামালগঞ্জে ডুবেছে দুই হাজার ৫০১ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ১৪ হাজার ৮৭৪ দশমিক ৮২ মেট্রিকটন ধান ও নয় হাজার ৮১৭ দশমিক ৩৮ মেট্রিকটন চাল, যার বাজার মূল্য ৪৮ কোটি ১০ লাখ ৫১ হাজার ৬২০ টাকা। তাহিরপুরে ডুবেছে এক হাজার ৬৭৬ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ১০ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৫৫ মেট্রিকটন ধান ও সাত হাজার ২৪ দশমিক ৭৪ মেট্রিকটন চাল, যার বাজার মূল্য ৩৪ কোটি ৪২ লাখ ১২ হাজার ২৬০ টাকা। ধর্মপাশায় ডুবেছে চার হাজার ২৯১ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৩৪ দশমিক ১৮ মেট্রিকটন ধান ও ১৬ হাজার ৭৮৬ দশমিক ৫৬ মেট্রিকটন চাল, যার বাজার মূল্য ৮২ কোটি ২৫ লাখ ৪১ হাজার ৪৪০ টাকা। ছাতকে ডুবেছে ৪৭ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ৩৩৮ দশমিক শূণ্য ৩০৩ মেট্রিকটন ধান ও ২২৩ দশমিক এক মেট্রিকটন চাল, যার বাজার মূল্য ১০ কোটি ৯৩ লাখ এক হাজার নয়শ টাকা। দিরাইয়ে ডুবেছে তিন হাজার ১০৫ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ২০ হাজার ৮৭ দশমিক ৮৩ মেট্রিকটন ধান ও ১৩ হাজার ২৫৭ দশমিক ৯৭ মেট্রিকটন চাল, যার বাজার মূল্য ৬৪ কোটি ৯৬ লাখ ৪০ হাজার ৫৩০ টাকা। শাল্লায় ডুবেছে তিন হাজার ৫৬ দশমিক পাঁচ হেক্টর, ক্ষতি হয়েছে ২০ হাজার ৩৭৫ দশমিক ৯১ মেট্রিকটন ধান ও ১৩ হাজার ৪৪৮ দশমিক এক মেট্রিকটন চাল, যার বাজার মূল্য ৬৫ কোটি ৮৯ লাখ ৫৬ হাজার নয়শ টাকা।
সূত্র মতে, ক্ষয়ক্ষতির দিক দিয়ে প্রথম স্থানে রয়েছে ধর্মপাশা উপজেলা, ক্ষতির পরিমাণ চার হাজার ২৯১ হেক্টর, দ্বিতীয় স্থানে শাল্লা, ক্ষতির পরিমাণ তিন হাজার ৫৬ দশমিক পাঁচ হেক্টর। আর সর্বনিম্ন ক্ষয়ক্ষতির হয়েছে ছাতকে ৪৭ ও বিশ্বম্ভরপুরে ৩০ হেক্টর।
উল্লেখ্য, সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর বোরো ধানের মোট আবাদ হয়েছে দুই লক্ষ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর, এরমধ্যে হাইব্রিড ৭১ হাজার ৪৮৬ হেক্টর, উফসি এক লক্ষ ৫১ হাজার ৭৫ হেক্টর, স্থানীয় ৯৫০ হেক্টর। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে নয় লক্ষ ২৫ হাজার ১৩৭ মেট্রিকটন। এরমধ্যে হাইব্রিড তিন লক্ষ ৪১ হাজার ৭০৩ মেট্রিকটন, উফসি পাঁচ লক্ষ ৮১ হাজার ৬৩৯ মেট্রিকটন, স্থানীয় এক হাজার ৭৯৫ দশমিক পাঁচ মেট্রিকটন।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, স্বাভাবিকভাবেই আমাদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা হোছট খাবে। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিলো প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার ধান উৎপাদন, সেখানে তিন থেকে সাড়ে তিনশ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সঙ্গত কারণেই এটিকে বিপর্যয় বলা যায় না। তাছাড়া এ বছরের মতো সমস্যাও প্রতি বছর হয় না। বিশেষ করে এ বছর অতি বৃষ্টি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাওর রক্ষা বাঁধের কিছু জটিলতা, নদ-নদী ও খাল-বিল এবং হাওরে পানি ধারণের ক্ষমতা কমে যাওয়াতে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহযোগিতা হিসেবে বর্তমানে কিছুটা ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে বলেও তিনি জানান।

নিউজটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2017-2019 AmarSurma.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com